মাগুরার বাণী

মুক্তিযোদ্ধা বনাম করোনাযোদ্ধা।

মুক্তিযোদ্ধা বনাম করোনাযোদ্ধা।

 

অধ্যক্ষ মাজেদ রেজা বাঁধন
শিক্ষক ও সাংবাদিক

সারা বিশ্বের হতভাগা অসহায় মানব জাতি অন্ধদের হাতি দেখার গল্পের মত এক নিদারুন অভিজ্ঞতা অর্জন করে চলেছে প্রতি মুহূর্তেক। আক্রান্ত অনাক্রান্ত সবাইকে যে যেমনভাবে পারে ইচ্ছামত আদেশ, উপদেশ, নিষেধ ও পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে অনবরত। নিরুপায় হয়ে মানুষও মরিচিকার মত দিকবেদিক তার পিছনে ছুটছে। তবে রক্ষা হচ্ছে না কোনভাবেই। সারা বিশ্বের প্রতীক্ষিত নয়নগুলো তাকিয়ে আছে সেই মাহিন্দ্রক্ষণের জন্য কখন যেন গ্রহণযোগ্য জীবন রক্ষাকারী কিছু আবিস্কার হয়। যেখানে জন্ম মৃত্যুর স্বাভাবিকতা নাই। যখন তখন পরিবারসহ আক্রান্ত হয়ে ওলোট পালোট হয়ে যেতে পারে সব আশা, নিরাশা হতাশা, স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদি সব পরিকল্পনা। আতংক ও দুশ্চিন্তায় ছেকে ধরেছে কখন যেন চলে যেতে হয় সব মায়া ত্যাগ করে প্রিয় এই সুন্দর ভুবনটাকে ছেড়ে।

দেশ, জাতি তথা বিশ্ব যখন ম্যাসাকারের সন্ধিঃক্ষণে দাঁড়িয়ে তখনও কিছু দীর্ঘয়োদি সুযোগ সন্ধানী দূরভিসন্ধি পেতাত্বা এই চরম সংকটের সুযোগে মানুষকে বোকা বানিয়ে নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। লোক দেখানো কৃত্তিম, মেকি জনসেবা, করোনা পরবর্তী সময়ে, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সুনাম, সুখ্যাতি ও সুযোগ সুবিধার ন্যায় পেতে নিজেকে নিজে করোনা যোদ্ধা, সেচ্ছাসেবক, মানবতার ফেরিওয়ালা ইত্যাদি সংবেদনশীল স্পর্শকাতর নামে নামকরণ করে আত্ম প্রচারে মহা ব্যস্ত।

এদেশের বীর মুক্তিযোদ্ধারা নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধকরে এবং অনেক ত্যাগের বিনিময়ে এদেশের মানুষকে একটি লাল সবুজের পতাকা উপহার দিয়েছিলো। তাই এদেশের কৃতজ্ঞ মানুষেরা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদেরকে বীর মুক্তিযোদ্ধা উপাধিতে ভ’ষিত করেছিলেন। তাঁদের অকৃত্তিম বীরত্বের সুফল হিসাবে আমরা পেয়েছিলাম সবার প্রিয় এই জন্মভ’মি বাংলাদেশ। কিন্তু লোভের বশবর্তী হয়ে বৈশ্বিক মহামারি নামক এই করোনাকালীন সময়ে দেশের কিছু দুরভিসন্ধি সুযোগ সন্ধানীরা নিজেরা নিজেদেরকে করোনা যোদ্ধা উপাধি দিয়ে শুধু প্রচার সর্বস্ব নামেমাত্র ত্রাণ দিয়ে, নামি দামি ব্রান্ডের চোখ ধাঁধানো বাহারি ক্যামেরা পোষাকে সস্তায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমকে ব্যবহার করে লাইভ টক শো, বাইক মহড়ার একই ভিডিও ও ছবি বারংবার আপলোপডসহ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার করে আম জনতাকে বোকা বানানোর অপকৌশলে লিপ্ত রয়েছে বলে প্রতিয়মান হচ্ছে।

অন্যের ত্রাণ বাহারি মড়কে সাজিয়ে নিজ নামে চালানোর অপচেষ্টা। নিজ স্বজনদের মধ্যে আংশিক বিতরণ করে লাইভের মাধ্যমে নিজ নামে প্রচার করে প্রহসন করায় ব্যস্ত। অনেকে ধার করা এইসব ত্রাণের সিংহভাগ নিজ পকেটস্ত করে যাচ্ছে বলে বিশ্বাসযোগ্য জনশ্রুতি রয়েছে।

যোদ্ধা, ফ্রন্ট লাইনের যোদ্ধা, সেচ্ছাসেবক, মানবতার ফেরিওয়ালা’র মত বিশেষ সময়ের মহৎ ও মহান পদবিগুলোকে বিশ্বের এই স্পর্শকাতর ক্রান্তিকালের সুযোগ নিয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে নিজ ও নিজের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে স্বঘোষিতভাবে ব্যবহার করে এধরনের মহান উপাধিগুলোকে কলঙ্কিত বা ভুলুন্ঠিত করা সমীচীন নয়।

এমন একটি মহা দূর্যোগে নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করতে চাইলে সেটা কিন্তু ইতিহাসে নেতিবাচক হিসাবে পৃথিবী লয়ের পূর্ব পর্যন্ত অম্লান হয়ে থাকবে মীরজাফর, হিটলারসহ ইতিহাসের অন্যান্য কলঙ্কিত ও ঘৃর্ণিত চরিত্রের ন্যায় প্রতিটি প্রজন্মের নিকট। অনতিবিলম্বে নিক্ষিপ্ত হতে হবে ইতিহাসের আস্তাকুড়ে।

শুধু লোক দেখানোর বা নিজ স্বার্থে নয় মানবকূলের এই মহা দুর্যোগে ৭১ এ গজরে ওঠা এদেশের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ন্যায় উদারচিত্তে নিঃস্বার্থভাবে মানব কল্যাণে মন থেকে অকৃত্তিম কিছু করলে তাহা অবশ্যই ইতিবাচক কর্মরূপে অম্লান হয়ে থাকবে বিশ্ব ইতিহাসে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাদেরকে শ্রদ্ধাভরে অবনত শিরে স্মরণ করবে। মহান হৃদয়ের ব্যাক্তি হিসাবে তাঁদেরকে অবশ্যই স্বীকৃতি দিবে বিশ্ববাসি।

করোনা মহামারি দীর্ঘতর হওয়ায় কৃত্তিম, ভন্ড, লোক দেখানো, স্বার্থবাদি, সুযোগ সন্ধানী, সুবিধাবাদি স্বঘোষিত যোদ্ধা, মৌসুমি সেচ্ছাসেবক ও ফেরিওয়ালাদের অধিকাংশই সটকে পড়েছে, ইতোমধ্যে জাতির কাছে তাদের স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে, সচেতন ও বিচক্ষণ জাতিও তাদেরকে চিহ্নিত করতে পেরেছে।

তবে প্রকৃত দেশপ্রেমিক, সেবক ও মানবতাবাদীরা এখনও জনকল্যাণে জনগনের পাশে আছে এবং যত বড় মহা দুর্যোগ যত দীর্ঘ মেয়াদি হোক না কেন তারা কিন্তু অধৈর্য না হয়ে জাতির পাশে ছিলো এবং থাকবে। এধরনের মহান ব্যাক্তিত্ব যদিও কোন প্রাপ্তির আশায় কিছু করে না তবুও দেশ, জাতি, তথা বিশ্ব তাদেরকে ভুলবে না, স্মরণ করবে অনন্তকাল ইতিহাস তাদের পক্ষে সাক্ষী হয়ে থাকবে নিশ্চয়।

শেয়ার করুন

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *