মাগুরার বাণী

ঠিকানা বিহীন ঠিকানা খুঁজে বের করা একমাত্র বাবার পক্ষেই সম্ভব।

ঠিকানা বিহীন ঠিকানা খুঁজে বের করা একমাত্র বাবার পক্ষেই সম্ভব।

অধ্যক্ষ মাজেদ রেজা বাঁধন(শিক্ষক ও সাংবাদিক):

একজন বাবা হিসাবে খুব ভালোভাবেই উপলব্দি করতে পারি সন্তান সাময়িকের জন্য দৃষ্টির আড়ালে গেলে নিজের ভিতরটায় কেমন শূন্যতার সৃষ্টি হয়। সন্তানের আব্দার পূরণ না করা পর্যন্ত কতটা ব্যাকুলতায় মুহূর্ত পার করতে হয়। আব্দার পূরণে ব্যর্থ হলে নিজের কাছে পুরো পৃথিবীটাকে ব্যর্থ মনে হয়। ঐ মুহূর্তে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় ও অপদার্থ হতভাগা মনে হয়। একটি দিন সন্তানকে স্পর্শ না করে গায়ে হাত বুলিয়ে ঘুম পারাতে না পারলে কেমন অস্থিরতা পেয়ে বসে। সন্তানের চোখের জল গড়ানোর মুহূর্ত কিভাবে একজন বাবাকে বিদ্ধ করে, হৃদয়টাকে ক্ষত বিক্ষত করে।

বয়বৃদ্ধ অসুস্থ্য ক্লান্ত শরীরে এই বিশাল পৃথিবীতে ঠিকানা বিহীন ঠিকানা খুঁজে বের করা একমাত্র একজন বাবার দ্বারাই সম্ভব সেটা বুঝতে নিজেকে বাবা হওয়া পর্যন্ত সময় লেগে গেল আমার। নিজে বাবা হয়ে উপলব্দি হলো একজন বাবার ত্যাগের সীমার ব্যাপ্তি কতটা অসীম। এই অপরিমাপযোগ্য অত্যুলনীয় ত্যাগ প্রত্যেকটি বাবার রন্ধে রন্ধে বিদ্যমান। আমাদের সাত ভাই বোনদের জন্য আমার প্রান্তিক কৃষক বাবার যে ত্যাগ সেটার স্মৃতি আমাকে এখনও তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়।

ইংরেজি ২০০০ সালের শেষের দিকের কথা, সদ্য মাস্টার্স পাশ করেছি। মেস জীবন শেষ করে ঝিনাইদহের পাগলাকানাই মোড় এলাকার সিদ্দিকিয়া সড়ক নিবাসি সোয়েব ম্যানেজারের বাড়ির নিচ তলায় একটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে একাই বসবাস শুরু করেছি মাত্র। আসবাব বলতে ছিলো ফো¬রে বিছানা আর একটি প্লাস্টিকের চেয়ার। খাওয়া দাওয়া হামদহ এলাকায় একটি পরিবারে পেয়িং গেস্ট হিসাবে চলত। একদিন দুপুরে অপ্রত্যাশিত ভাবে আমার বাবা ফুপাত ভগ্নিপতি রিয়াজের সাথে এসে হাজির। বাবার এই অপ্রত্যাশিত আগমন আমাকে অবাক করেছিলো। আমার চিন্তাতেও ছিলো না যে, আমার বাবা ঝিনাইদহে চলে আসবে। তাছাড়া বাড়িতে আমার কোন ঠিকানাও দেওয়া ছিলো না। তারা শুধু জানত ঝিনাইদহ মেসে থাকে। মোবাইল ফোন তখন চালু হয়নি তাই যোগাযোগের মাধ্যম অর্থ বাড়িতে যাওয়া। আমি প্রত্যেক দুই মাসে একবার বাড়িতে গিয়ে বাবা মা এর সাথে দেখা করে আসতাম। কিন্তু বিশেষ কারনে ঐবার দুইমাস পার হয়ে গিয়েছিলো কিন্তু আমার বাড়ি যাওয়া হয়নি। দুই মাস পার হয়ে গেছে কিন্তু আমি বাড়িতে যাইনি তাই সে চলে এসেছিল। আমি জানতে চাইলাম আব্বা আপনি কিভাবে আসলেন আমিতো কোন ঠিকানা বাড়িতে রেখে আসিনি। বাবা আমাকে বলল তোমার ঠিকানা খুঁজে পেতে অনেক কষ্ট হয়েছে। আমি সকালে ঝিনাইদহে এসেছি আর বিভিন্ন মেসে গিয়ে তোমাকে খোঁজ করেছি কিন্তু কোন মেসে তোমাকে খুঁজে পাই নাই। হামদহ একটি মেসের একটি ছেলে বলল তুমি এখানে থাক তাই এখানে চলে আসলাম। দুই মাস হয়ে গেছে কিন্তু তুমি বাড়ি যাওনি তাই দুঃচিন্তা হচ্ছিল তোমার মা অস্থির হয়ে গেছে তাছাড়াও তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছিলো তাই চলে আসলাম এই বলে আমার বাবা দীর্ঘক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে তৃপ্তিসহকারে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।

পাগলাকানাই মোড় থেকে কিছু ফলমূল এনে সামান্য নাস্তার ব্যাবস্থা করলাম। পরে বাবাকে ঐদিনেই গাড়িতে তুলে দিলাম বাবা গ্রামের বাড়ি চলে গেলেন।
এটাই ছিলো আমার আব্বার সাথে আমার শেষ দেখা ও সাক্ষাত। এই ঘটনার অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই ঐ বছর অথ্যাৎ ২০০০ সালের অক্টোবর মাসের ৪ তারিখে আব্বার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে তারপর বাড়িতে গেলাম। বাবা হয়ত বুঝতে পেরেই আমার সাথে শেষ দেখা করতে এসেছিলেন কিন্তু আমি তা বুঝতে পারিনি।

আমাদের প্রতি আমার বাবার ত্যাগের স্মৃতি আমাকে বুঝিয়েছে যে,একজন বাবা তার সন্তানদের কল্যাণে সব কিছু করতে পারে। বাবাদের কখনও কখনও ন্যায়, অন্যায় হিতাহিত জ্ঞান থাকে না তার সন্তানের কল্যাণে। একজন বাবার সুখ, শখ, আল্লাদ, ইচ্ছা, আকাঙ্খা সব কিছু সন্তানের মঙ্গলে। সন্তানের জন্য উজার করে দেওয়াতে বাবার পরম শান্তি। বাবার জন্মই যেন সন্তানের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করার নিমিত্তে। একজন বাবা সন্তানের জন্য নিজেকে যতটা উজার করে দিতে পারে ততটা শান্তির মহা সাগরে ভাসতে থাকে। যত ত্যাগ তত শান্তি। সন্তানের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে পেরে বাবার যে অনাবিল প্রশান্তি যা সে আর কোথাও খুঁজে পায় না। সন্তানের সকল ধরনের চাহিদা পূরণে একজন বাবার তুলনাহীন প্রচেষ্টা অবিরত চলতেই থাকে। নিজের শরীর,খাওয়া দাওয়া, চলা ফেরা, কাপড় চোপড়, আরাম আয়েশ নিয়ে ভাববার এতটকুু ফুসরত নেই একজন বাবার।

বাবাকে ছাতা বা বটবৃক্ষ যার সাথেই তুলনা করার চেষ্টা করি না কেন বাবার তুলনা শুধু বাবাই হয় অন্য কিছুই নয়। সন্তানের সফলতায় যেমন বাবার চোখে প্রশান্তির অশ্রুধারা ঝরে ঠিক তেমনি সন্তানের ব্যর্থতা বাবার হৃদয়ে ক্ষতের সৃষ্টি করে। সন্তানের কল্যাণে সর্বস্ব ত্যাগে বাবা এতটুকু দ্বিধাবোধ করে না বা দ্বিতীয়বার ভাবে না। এমন কি বাবার জীবনের অন্তিম অংশে শেষ সঞ্চয়টুকু সন্তানের হাতে তুলে দিতে কালবিলম্ব করে না।

সেই জন্মদাতা বাবা যার ঔরসে আমাদের জন্ম, যে সারাটি জীবন সন্তানকে শুধু দিয়ে গেল তার পড়ন্ত বিকালে আমরা কিভাবে তাকে মূল্যায়ণ করছি সেটা আমাদের ভাবনাতে থাকে না। প্রতিদান হিসাবে তাঁরা আমাদের কাছ থেকে পাচ্ছে অবহেলা, অবজ্ঞা আর অনাদর।

অতি আদরের সেই সন্তান একদিন সেই বাবাকেই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিচ্ছে, চোখের পানি ঝরাচ্ছে, ক্ষত বিক্ষত হৃদয়টাকে ভেঙ্গে চুরে চুরমার করে দিচ্ছে। নিজ স্ত্রী, পুত্র, কন্যা নিয়ে সান সৈকতে মজা মাস্তি করছি। আর বাবার খোঁজ শুধু ঈদে যাকাত ফিতরায় মূল্যায়ণ করছি বা বাবা দিবসে জাপটে ধরে ছবি পোস্ট করার উদ্দেশ্যে একটি নতুন কাপড় দান করছে। বছরে এক দুইদিন বাবার সাথে সেলফি পোষ্ট করে বাবার প্রতি দায়িত্ব কর্তব্য পালনের অভিনয় করে বাবার সাথে প্রহসন করছে। অনেকে বাবার শেষ সম্বলটুকু সুকৌশলে নিয়ে বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে যেতে বাধ্য করছে। হায়রে নিঠুর নির্দয় অকৃজ্ঞ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব।

অনেকে নিজের স্ত্রীর ভয়ে বা অজুহাত দেখিয়ে বৃদ্ধ বাবাকে অবজ্ঞা অনাদর করে এমন কি খোঁজ খবরটুকু নেয় না । আল্লাহ যতই মহান বা মহানুভব বা ক্ষমাশীল হোক না কেন, এই স্বার্থপর পৃথিবীর স্বার্থপর মানুষদেরকে কি তিনি ক্ষমা করবেন, না আমরা ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য?

সাত রাজার ধন, কলিজার টুকরা, হৃদয়ের স্পন্দন, নয়নের মনি সন্তানের জন্মদিনে একজন অকৃজ্ঞ কুলাঙ্গার সন্তান হিসাবে নয়, তোমার শুভ জন্মদিনে একজন অসহায় বাবা হিসাবে তোমাদের নিকট প্রাণের চাওয়া, তোমরা যেন আমাদের মত অকৃজ্ঞ স্বার্থপর হয়ে বাবাকে অবজ্ঞা অবহেলা করো না। আমাদের মত অমানুষ হয়ো না একজন প্রকৃত মানুষের মত মানুষ হও। তোমাদের জন্য আমার এ দোয়া নিরন্তর।

সম্পাদকীয়/মাগুরার বাণী

শেয়ার করুন
  •  
    94
    Shares
  • 94
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *