মাগুরার বাণী

আমার অগ্রজ এম তোরাব আলী

আমার অগ্রজ এম তোরাব আলী

এ এস , এম , সাইফুজ্জামান:

বছর পেরিয়ে গেল , আমার আগ্রজ এম তোরাব আলী এ জগতের মায়া ছেড়ে অনন্তে মিশে গেছেন। সেদিন ছিল ১১ সেপ্টম্বর-২০১৯ , বাংলা ২৭ ভাদ্র ১৪২৬, বুধবার।পাশের মসজিদে ফজর নামাজ শেষে ঘরে ফিরেই তিনি অসুস্থ্য বোদ করেন। চিকিৎসা-সুযোগ না দিয়েই বুক ব্যাথার ছলনায় ভোর ছ’টায় ৮১ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার আকস্মিক তিরোধান হাটতে-হাটতে , বিনা নোটিশে ! এম তোরাব আলী ৪৪ বছর কায়-মনে শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর ছাত্র-ছাত্রীরা সমাজের সকল ক্ষেত্রে ছড়িয়ে আছেন। ১৯৬৪ সাল থেকে ৪১ বছর তিনি শ্রীপুর মহেশচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ে ছিলেন; প্রথম সহকারী প্রধান শিক্ষক , পরের ২৭ বছর প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে। ১৯৫৫ সালে এই প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি ম্যাট্রিক পাশ করেন। শৈশব থেকেই শিক্ষা অনুরাগী এম তোরাব আলী ১৯৪৫ সালে জোকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত শ্রীকোল জুনিয়র হাইস্কুলে পড়েন। মাগুর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের ১ম ব্যাচের গ্রাজুয়েট এম তোরাব আলী ১৯৬০ সালে বি.এ. পরীক্ষা শেষে আবাইপুর রামসুন্দর ইন্সটিটিউটে শিক্ষকতা শুরু করেন। শৈলকূপা উপজেলার এই প্রতিষ্ঠানে থাকাকালীনই ১৯৬৪ সালে তিনি রাজশাহী শিক্ষক প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয় থেকে বি.এড কোর্স করেন এবং পরবর্তীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে এম.এ পাশ করেন।

এম তোরাব আলী ২১ বছর যশোর শিক্ষাবোর্ডে বাংলা ও ইংরেজী বিষয়ের প্রধান পরীক্ষক ছিলেন। তাঁর রচিত ঘবি ঝুংঃবস এৎধসসধৎ ধহফ ঈড়সঢ়ড়ংরঃরড়হ ইংরেজী ব্যাকরণটি যশোর, খুলনা, বরিশাল বিদ্যালয় সমূহে সমাদর পায়। বাংলা-ইংরেজীতে অনেক লিখলেও কোন পূর্ণ প্রকাশনায় তিনি খুবই উদাসীন ছিলেন।

শিক্ষা বিভাগ এক সময় তাঁকে খুলনা বিভাগের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ‘সমাজসেবক – প্রধান শিক্ষক’ এর সনদ প্রদান করে। সমাজসেবা এবং শিক্ষাকতাকে তিনি পাশাপাশি স্থান দিয়েছিলেন বিধায় তাঁকে এই সম্মান দেওয়া হয়।

আজকের জোকা গ্রামে প্রায় শতভাগ গুণগত শিক্ষাহার অর্জনে এম তোরাব আলীর ভূমিকা গ্রামবাসী মনে রেখেছে। ১৯৬০ সাল থেকে তিনি বাড়ী বাড়ী ঘুরে জোকা গ্রামের ছেলে-মেয়েদের শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করে তোলেন। তখন বিশেষ করে মুসলিম পরিবার শিক্ষাকে গুরুত্ব দিত না। একই অবস্থা ছিল নিম্নsssn বর্ণের হিন্দু পরিবারে। এই সংকটে এম তোরাব আলী সকল ছেলে-মেয়ের অভিভাবকের দায়িত্বে অবতীর্ণ হলেন। রাতে ঘুমিয়ে পড়া ছেলেদের তিনি ডেকে তুলে বইয়ের সামনে বসাতেন- নিজ বাড়িতে এনে তাঁদের বিনা পয়সায় কোচিং করাতেন। নবম-দশম শ্রেণির ছেলেদের মাধ্যমিক পরীক্ষায় সফল করতে বিশেষ কোচিং এর ব্যবস্থা করতেন।

স্কুলেও তিনি একই ভাবে ছাত্রদের খোঁজ খবর রাখতেন। অর্থাভাবে পড়াশোনা বাদ দেওয়া ছাত্রদের রাড়ী থেকে ডেকে এনে বিশেষ সুবিধায় পূনরায় স্কুলে ভর্তি করে নিতেন। তার এ প্রচেষ্ঠায় অনেক ছাত্রই আজ সরকারী-বেসরকারী উচ্চ পদে সমাসীন রয়েছেন।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পূনঃনির্মাণ বা স্থাপনে এম তোরাব আলী আজীবন সক্রীয় ছিলেন। ১৯৬৪ সালে জোকা প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘরটি ছিল কাঠের খুটির উপর টিনের চালার তৈরি। শ্রীপুর থানার আরও কয়টি স্কুলের মতই এটির পূনৎনির্মাণে সরকার থেকে দশ হাজার টাকা দেওয়া হলো। এম তোরাব আলী জনগনের থেকে বাঁশ কাঠ সংগ্রহ করে পোঁড়া ইটের তৈরি ৫ হাজার বর্গফুটের স্কুলের ঘরটি বানালেন- যা আজও বিদ্যমান। এই স্কুলের সৌন্দর্য্য বৃদ্ধিতে ছেলে-মেয়েরা স্কুলে আসতে শুরু করলো। জোকা এর সুফল ভোগ করছে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠা ছাড়াও নিজ গ্রামে মসজিদ-মাদ্রাসা গোরস্থান ও রাস্তা ঘাট নির্মানে এম তোরাব আলীর আবদান আজ জোকা গ্রাম স্মনণ করছে- করবে আগামী দিনেও। মৃত্যর বছর খানেক আগে জোকা গ্রামের পূর্ব সীমানায় তার নির্মিত স্বাগত-পিলারটি সকলের দৃষ্টি আকর্ষন করে চলেছে। জোকা গ্রামে এম তোরাব আলী সর্বশেষ কীর্তি পূননির্মিত জোকা পূর্বপাড়া জামে মসজিদ। ৪৫ লক্ষ টাকা সংগ্রহে ১৯৩৪ সালের এই ছাপরা মসজিদটাকে তিনি ১০ বছরে ২ তালায় রুপান্তরিত করেন। মৃত্যুর ৫ দিন আগে তিনি মসজিদটির তিন তালার কাজ সমাপনের প্রবল আকাংখা প্রকাশ করে গেছেন। নিজ পরিবারে তিনি ছিলেন একজন আদর্শ অভিভাবক। যৌথ পারিবারিক পরিবেশে তিনি স্বাছন্দ বোধ করতেন। বাবা-মা-ভাই বোনের আব্দার পূরনের মধ্যে প্রশান্তি খুজে পাওয়া এম তোরাব আলী নিজের এবং ভাইয়ের সন্তানদের সমান চোখে দেখতেন। তাদের নিরাপত্তা-শিক্ষা ও প্রগতির পতি আজীবন মনোযোগী ছিলেন তিনি। আমাকে তিনি পুত্রের মত দেখতেন।

তিনি একই মনোভাব দেখিয়েছেন বিদ্যালয় প্রশাসনে এবং নিজ গ্রামে। জোকা গ্রামের শান্তি শৃংখলা রক্ষায় এম তোরাব আলী আজীবন শ্রেষ্ঠ অভিভাবকের ভুমিকা পালন করেছেন-তাই তিনি ছিলেন সর্বজন শ্রেদ্ধেয়। এর প্রমান শোকাহত জনতা তাঁর মৃত্যু সংবাদে ছুটে এসে বিন¤্র চিত্তে সেদিন শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলো। স্কুল- কলেজের শিক্ষক, সর্বদলীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, ছাত্র-জনতা, গাড়ী চালক, ভ্যান চালক সবাই ভারাক্রান্ত মনে পরিবারের প্রতি শোক জানিয়ে ছিলেন। শোক জানিয়ে ছিলেন মাননীয় সাংসদ, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, উপজেলা চেয়ারম্যান ও তার পরিষদসহ সমাজের সকলস্তরের মানুষ। এই উপজেলার ৮৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয় সেদিন একযোগে তার আত্মার শান্তি কামনা করেছিল।

শোকের মেয়াদ ক্ষণস্থায়ী এবং আমরা এ বেদনা ভুলে যাব কিন্তু এম তোরাব আলীর তিরোধানে সমাজ এক আদর্শ শিক্ষক, অভিবাবক , পিতা ও সমাজনেতাকে হারিয়ে যে ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে তা সহজে পূরন হবার নয়।

শেয়ার করুন
  •  
    218
    Shares
  • 218
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *